$type=ticker$meta=0$readmore=0$snippet=0$columns=4

সূরা আল হুজরাত ১-৮

SHARE:

দারসুল কুরআন সূরা আল হুজরাত ১-৮ বঙ্গানুবাদ ঃ ১. মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের চেয়ে অগ্রগামী হয়োনা এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছ...


দারসুল কুরআন
সূরা আল হুজরাত ১-৮
বঙ্গানুবাদ ঃ
১. মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের চেয়ে অগ্রগামী হয়োনা এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন।
২. হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের আওয়াজ রাসূলের আওয়াজের চেয়ে উচু করোনা এবং উচ্চস্বরে নবীর সাথে কথা বলোনা যেরুপ তোমরা নিজেরা পরস্পর বলে থাকো। এমন যেন না হয় যে; তোমাদের অজান্তেই তোমাদের সব কাজকর্ম ধ্বংস হয়ে যায়।
৩. যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে তাদের কন্ঠ নিচু রাখে তারাই সে সব লোক আল্লাহ যাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য বাছাই করে নিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহ পুরস্কার।
৪. হে নবী, যারা আপনাকে প্রাচীরের বাইরে থেকে ডাকাডাকি করতে থাকে তাদের অধিকাংশই নির্বোধ
৫. যদি তারা আপনার বের হয়ে আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারন করত তবে তাদের জন্য মঙ্গলজনক হতো। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
৬. হে ঈমানদারগণ, যদি কোন ফাসেক তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখ। এমন যেন না হয় যে, না জেনে শুনেই তোমরা কোন গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।
৭. ভালো করে জেনে রাখ আল্লাহর রাসূল তোমাদের মাঝে রয়েছেন। তিনি যদি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তোমাদের কতা মেনে নেন তবে তোমরাই অনেক সমস্যার মধ্যে পড়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ঈমানের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের কাছে পছন্দনীয় করে দিয়েছেণ। পক্ষান্তরে কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে ঘৃনিত করে দিয়েছেন।
৮. আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে এসব লোকই সৎপথের অনুগামী। আল্লাহ জ্ঞানী ও কুশলী।
নামকরণ ঃ ৪র্থ আয়াতের বাক্য থেকে গৃহীত।
নাযিল হওয়ার সময়কাল ঃ বিভিন্ন বর্ণনা ও সুরার বিষয়বস্তু থেকে বোঝা যায় এ সুরা বিভিন্ন পরিবেশ ও ক্ষেত্র নাযিল হওয়া হুকুম আহকাম ও নির্দেশ সমূহের সমষ্টি। বিষয়বস্তু সাদ্যৃশ্যের কারনে এগুলোকে এখানে একত্রিত করা হয়েছে।
৪র্থ আয়াত সম্পকে ঘটনা -
একবার বনী তামিম গোত্রের কিছু লোক রাসূল (সা:) এর নিকট উপস্থিত হয়। এই গোত্রের শাসনকর্তা নিয়োগ সম্পর্কিত আলোচনা চলছিল। হযরত আবু বকর (রা:) রা’কা ইবনে হাকিমের নাম এবং হযরত উমর (রা:) আকরা ইবনে হাফসের নাম প্রস্তাব করেন। হযরত আবু বকর (রা:) এবং হযরত উমর (রা:) এর মধ্যে চলমান এ আলোচনা এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটিতে উন্নীত হয়ে উভয়ের কন্ঠস্বর উচু হয়ে যায়। (বুখারী)
হিজরী ৯ম সন এ প্রতিনিধি দলের আগমনের সময়। আলোচ্য আয়াতসমূহের অবতরণ সম্পর্কে কুরতুযীর ভাষ্য অনুযায়ী ৬টি ঘটনা বর্ণিত আছে। সব ঘটনা নির্ভুল।


৬ষ্ঠ আয়াত সম্পর্কে ঘটনা ঃ
মুসনাদে আহমাদের বরাত দিয়ে ইবনে কাসীর -
বনী মুস্তালিক গোত্রের সরদার হারেস ইবনে মেরাব ইসলাম গ্রহণের পর রাসুল (সা:) তাকে যাকাত প্রদানের আদেশ দিলেন। তিনি যাকাত প্রদানে স্বীকৃত হলেন এবং তারা গোত্রে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে তাদের যাকাত আদায় করে জমা করে রাখবেন বললেন এবং রাসূল (সা:) কে একটি নিদিষ্ট তারিখে যাকাতের অর্থ নেবার জন্য কোন দুত পাঠাতে বললেন। কিন্তু নির্ধারিত তারিখ পার হয়ে গেলেও দুতের দেখা না পেয়ে হারেস আশংকা করলেন রাসূল (সা:) কোন কারনে তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং একথা তিনি ইসলাম গ্রহনকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছে প্রকাশ করে রাসূল (সা:) এর সাথে সবাই মিলে দেখা করার ইচ্ছা করলেন। এদিকে রাসূল নির্ধারিত তারিখে ওলীদ ইবনে ওকবা কে প্রেরণ করলেও তিনি পথিমধ্যে ধারনা করেন এই গোত্রের লোকদের সাথে তার পুরাতন শত্র“তা আছে। তাকে একা পেয়ে হত্যা না করে ফেলে। তিনি ফিরে আসেন এবং রাসূল (সা:) কে বলেন তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছে। রাসূল (সা:) রাগান্বিত হয়ে খালিদ ইবনে ওলীদের নেতৃত্বে একদল মুজাহিদ প্রেরণ করেন। অত:পর তা জানতে পেরে হারেস রাসূল (সা:) কে বলেন তিনি ওলীদকে দেখেনইনি।
কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে - ওলীদ ইবনে ওকবা (রা:) নির্দেশ অনুযায়ী বনু মুস্তালিক গোত্রে পৌছেন। গোত্রের লোকেরা অভ্যর্থনা জানানোর উদ্দেশ্যে বস্তি থেকে বের হয়ে আসে। ওলীদ সন্দেহ করে তারা বোধ হয় পুরাতন শত্র“তার কারনে তাকে হত্যা করতে আসছে। তিনি সেখান থেকে ফিরে এসে এ ধারনা ব্যক্ত করলে রাসূল (সা:) খালিদ ইবনে ওলীদ কে ঘটনা পর্যবেক্ষনের নির্দেশ দিলেন। তিনি ফিরে এসে সংবাদ দিলেন তারা ঈমানের উপর অটল রয়েছে/যাকাত দিতে প্রস্তুত।
ওলীদ ইবনে উকবা মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমান হয়েছিলেন।
তাই এটি স্পষ্ট যে এ যুগের বেশীর ভাগ অংশই মাদানী যুগের শেষ পর্যায়ে নাজিলকৃত।
আলোচ্য বিষয় ঃ
এ সুরার বিষয়বস্তু হলো মুসলমানদেরকে এমন আদব-কায়দা, শিষ্টাচার ও আচরন শিক্ষা দেয়া যা তাদের ঈমানসুলভ স্বভাব-চরিত্র ও ভাবমূর্তির উপযুক্ত ও মানানসই।
 প্রথম পাঁচ আয়াতে আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে আদব কায়দা শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
 এরপর নির্দেশ দেয়া হয়েছে প্রতিটি খবর বিশ্বাস করা এবং সে অনুযায়ী কর্মকান্ড করে বসা ঠিক নয়।
 মুসলমানদের দুটি দল যদি কোন সময় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সে ক্ষেত্রে অন্য মুসলমানদের কর্মনীতি।
 মুসলমানদেরকে কিছু খারাপ বিষয় থেকে আতœরক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে-
ড় একে অপরকে ঠাট্রা-বিদ্রুপ করা
ড় বদনাম উপহাস করা
ড় উপনামে ডাকা
ড় গোপন বিষয় খোজাখুজি
 সবশেষে বলা হয়েছে- ঈমানের মৌখিক দাবী প্রকৃত জিনিস নয় বরং সরল মনে আল্লাহ ও রাসূলকে মানা, কার্যত অনুগত থাকা এবং কুরবানী।
১. প্রথম আদব - আল্লাহ ও রাসূলের চেয়ে অগ্রগামী না হওয়া। এটা ঈমানের প্রাথমিক ও মৌলিক দাবী।
 নিজের মতামত ও ধ্যান ধারনাকে আল্লাহ রাসূলের সিদ্ধান্তের চেয়ে অগ্রাধিকার দিতে পারেনা এবং বিভিন্ন ব্যাপারে স্বাধীন মতামত পোষন করতে পারেনা।
 সুরা আহযাবের ৩৬ আয়াতে এরুপ নির্দেশ আল্লাহ ও তার রাসূল যে বিষয়ে ফয়সালা করে দিয়েছেন সে বিষয়ে আলাদা কোন ফয়সালা করার ইখতিয়ার কোন ঈমানদারের জন্য আর অবশিষ্ট থাকে না।
 এ নির্দেশটি শুধু ব্যক্তিগত নয় বরং মুসলমানদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য (সরকার, বিচারালয়, পার্লামেন্ট) সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীস ঃ
মুয়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেনের বিচারক করে পাঠানোর সময় নবী (সা:) তাকে জিজ্ঞেস করলেন “তুমি কিসের ভিত্তিতে ফয়সালা করবে?” তিনি বললেন- “আল্লাহ কিতাব অনুসারে।” নবী (সা:) বললেন যদি কিতাবে না পাওয়া যায় তিনি জবাব দিলেন আল্লাহ রাসূলের সুন্নাতের সাহায্য নেব? নবী (সা:) বললেন যদি সেখানে না পাও তিনি জবাব দিলেন তাহলে আমি নিজে ইজতেহাদ করব। তাই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাবই সর্বপ্রথম উৎস এবং তারপরই হাদীসের স্থান। এবং এক্ষেত্রে নিজেদের মতামতকে প্রাধান্য দিলে বোঝাপড়া হবে আল্লাহর সাথে।
২. যারা রাসূল (সা:) এর মজলিশে যাতায়াত করত তাদেরকে এ আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্যে তার সাথে কথা বলার সময় যেন তার মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রাখা হয়।
 এক্ষেত্রে যখনই নবী (সা:) এর আলোচনা করা হয় এবং তার হাদীস বর্ণনা করা হয় তখন পরবর্তী সময়ের লোকদের অনুরুপে শিষ্টতা বজায় রাখা দরকার
 এছাড়া নিজের চাইতে উচ্চ মর্যাদার লোকদের সাথে কথা বলার শিষ্টতা এখানে শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
 ইসলামে রাসূলের ব্যক্তিসত্ত্বার মর্যাদা এ আয়াত থেকে বোঝা যায়। রাসূলের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সামান্য শিথিলতায় সারা জীবনের সঞ্চিত পুজি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। নবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা না করা মূলত আল্লাহর প্রতি করা না করার পর্যায়ভুক্ত।
৩. অর্থ্যাৎ যে হৃদয়ে রাসূলের মর্যাদা নেই সে হৃদয়ে তাকওয়া থাকতে পারেনা। যারা বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তারা রাসূলের প্রতি তাদের পক্ষ থেকে যথাযথ মর্যাদা প্রদর্শন করে।
৪. আরবের সে পরিবেশে যেখানে সাধারন ভাবে মানুষ কোন প্রকার শিষ্টাচারের শিক্ষা পায়নি তাদের অনেকেই সময়ে সময়ে রাসূলের সাথে সাক্ষাতের জন্য হাজির হতো তার হুজরার চারিদিকে ঘুরে ঘুরে বাইরে থেকেই তাকে ডাকতো। স্বভাবগত কারনেই রাসূল (সা:) এসব সহ্য করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করলেন।
৫. অর্থ্যাৎ চিৎকার না করে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে রাসূল নিজেই এসে তাদের সাথে সাক্ষাত করতেন। এ আয়াতে এ ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন।
৬. অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে এটি ওলীদ ইবনে ওকবা ইবনে আবা মুআ’ইত সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।
হারেস ইবনে মেরার (উম্মুখ মুমিনিন হযরত জুয়াইরিয়ার পিতা) এক প্রতিনিধি দল নিয়ে রাসূলের দরবারে হাযির হন।
হযরত উম্মে সালামা বর্ণিত হাদীসে পুরো ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামের নাজুক পরিস্থিতিতে যখন একটি ভিত্তিহীন সংবাদকে কেন্দ্র করে এত বড় ভুল সংঘটিত হতে যাচ্ছিল সে মুহুর্তে আল্লাহ এ মৌলিক নির্দেশ দিলেন যে, যখন এমন কোন খবর পাওয়া যাবে যার ভিত্তিতে বড় রকমের কোন ঘটনা সংঘটিত হতে পারে তখন তা বিশ্বাস করার পূর্বে বার্তাবাহক কেমন ব্যক্তি তা যাচাই করতে হবে।
 যার বাহ্যিক অবস্থা দেখেই প্রতীয়মান হয় যে বার্তাবাহক নির্ভরযোগ্য নয় (ফাসেক) তবে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী কাজ করার পূর্বে তা যাচাই করা দরকার।
 যার চরিত্র ও কর্ম নির্ভরযোগ্য নয় এমন কোন সংবাদদাতার সংবাদের উপর ভিত্তি করে কোন, ব্যক্তি, জাতি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা ইসলামী সরকারের জন্য বৈধ নয়।
হাদীস শাস্ত্রবিদগণ এ প্রেক্ষিতে ‘জারহ ও তা’দীল’ এর নীতি উদ্ভাবন করেছেন।
 যাতে যাদের মাধ্যমে নবী (সা:) এর হাদীস পরবর্তী বংশধরদের নিকট পৌছেছিল তাদের অবস্থা যাচাই করা যায়।
 তাছাড়া সাক্ষ্য আইনের ক্ষেত্রে নীতি হলো এমন কোন ব্যাপারে ফাসেক ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহনযোগ্য হবেনা যা দ্বারা শরীয়তের কোন নির্দেশ প্রমানিত হয় কিংবা কোন মানুষের উপর কোন অধিকার বর্তায়।
তবে সাধারন পার্থিব ব্যাপারে প্রতিটি খবর অনুসন্ধান এবং সংবাদাতার নির্ভরযোগ্যতা জরুরী নয়। কারন আয়াতে গুরুত্বপূর্ণ খবর বলা হয়েছে।
৭. বন্ধু মুসতালিক গোত্র সম্পর্কে ওয়ালীদ ইবনে উকরার খবরের ভিত্তিতে নবী (সা:) তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহন করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু কিছু সাহাবী তৎক্ষনাৎ তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন করার জন্য নবী (সা:) কে পীড়াপীড়ি করছিল। এ প্রেক্ষিতে এই আয়াত।
৮. অর্থ্যাৎ কতিপয় লোক তাদের অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত জানালেও মুসলমানদের গোটা জামায়াত ভুল করেনি। মুমিনদের সঠিক পথের উপর কায়েম থাকার কারন হচ্ছে আল্লাহ তার দয়া ও মেহেরবানীতে ঈমানী আচরনকে তাদের জন্য প্রিয় ও হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন এবং নাফরমানী আচরনকে ঘৃনিত করে দিয়েছেন।
আয়াতের দুটি অংশে দুটি ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। “যারা বনু মুসতালিকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য পীড়াপীড়া করছিল তাদের কথা বলা হয়েছে।”
“কথা বলা হয়েছে যারা নিজেদের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করেনি। বরং ঈমানের দাবীর উপর ছিলেন।
তবে তারা ঈমানের প্রতি অটল ছিলনা একথা বলা হয়নি, বরং শিথিলতার কথা বলা হয়েছে। তাই তিনি (আল্লাহ) প্রথমে এর ভুল ও কুফল তুলে ধরেছেন।
৯. আল্লাহর অনুগ্রহ ও মেহেরবানী কোন ভাগ বাটোয়ারা নয়। তিনি এ বিরাট নেয়ামত জ্ঞান যুক্তির ভিত্তিতে দান করেন।
শিক্ষা ঃ
১) ধর্মীয় আলেমদের ক্ষেত্রে এ বিধান কার্যকর কারন তারা পয়গম্বরদের উত্তরাধিকারী।
- একদিন রাসূল (সা:) আবু দারদা (রা:) কে আবু বকর (রা:) এর অগ্রে চলতে দেখে সর্তক করে বললেন: তুমি কি এমন ব্যক্তির অগ্রে চল যিনি ইহকাল ও পরকালে তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ? তিনি আরও বললেন: দুনিয়াতে এমন কোন ব্যক্তির উপর সুর্যোদয় ও সুর্যাস্ত হয়নি যে পয়গম্বরদের পর হযরত আবু বকর থেকে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। (রুহুল বয়ান)
-
২) উচ্চ স্বরে কথা না বলা ঃ
এ আয়াত নাযিলের পর -
 হযরত আবুবকর (রা:) আরজ করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ আল্লাহর কসম! এখন মৃত্যু পর্যন্ত আপনার সাথে কানাকানির অনুরুপে কথা বলব। (বায়হাকী)
 হযরত উমর (রা:) এরপর থেকে এত আস্তে কথা বলতেন যে, প্রায়ই পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হতো। (সেহাহ)
 হযরত সাবেত ইবনে কায়সের কন্ঠস্বর স্বভাবগতভাবেই উচু ছিল। এ আয়াত নাযিলের পর তিনি ভয়ে সংযত হলেন এবং কন্ঠস্বর নিচু করলেন। (দুররে মনসুর)
 কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী (রহ:) বলেন রাসূল (সা:) এর সম্মান ও আদব তার ওফাতের পরও জীবদ্দশার ন্যায় ওয়াজিব। কোন কোন আলেম বলেন তার কবরের সামনে উচ্চস্বরে কথা বরা আদবের খেলাফ। যে মজলিসে হাদীস পাঠ হয় সেখানে হট্টগোল করা বে-আদবী।
 কন্ঠস্বর উচু করলে আমল বিনষ্ট হবে কেন?
 সৎকর্ম বিনষ্ট করে-
১) কুফরী ২) ঈমান ইচ্ছাধীন কাজ কুফরীও ইচ্ছাধীন কাজ।
কিন্তু আয়াতে বলা হয়েছে। সুতরাং এখানে কুফরীর শাস্তি কিভাবে হতে পারে।
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ:) তার বায়ানুল কুরআনে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন - রাসূলের কন্ঠ থেকে উচু হলে বিনষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে কারন রাসূল কষ্ট পাবেন।
৩) হুজরার বাইরে থেকে ডাকাডাকি করা ঃ
- ইমাম বগাভী (রহ:) কাতাদাহ (রা:) এর রেওয়ায়েতক্রমে বর্ণনা করেন বনু তামীমের লোকগণ দুপুরের সময় মদীনায় উপস্থিত হয়েছিল। তখন রাসূল (সা:) কোন এক হুজরায় বিশ্রামরত ছিলেন। তারা ছির বেদুঈন এবং সামাজিকতার রীতি নীতি থেকে অজ্ঞ। তারা হুজরার বাইরে থেকেই ডাকাডাকি শুরু করল।
- “হে মুহাম্মদ আমাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আসুন” (মাযহারা)
ড় সাহাবী ও তাবেয়ীগণ তাদের আলেমদের সাথেও অনুরুপ ব্যবহার করতেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত আছে- আমি যখন কোন আলেম সাহাবীর কাছে থেকে কোন হাদীস লাভ করতে চাইতাম তখন তার গৃহে পৌছে ডাকাডাকি বা দরজার কড়া নাড়া থেকে বিরত থাকতাম এবং দরজার বাইরে বসে অপেক্ষা করতাম। তিনি যখন নিজেই বাইরে আসতেন তখন আমি তার নিকট হাদীস জিজ্ঞেস করতাম। তিনি দেখে বলতেন হে রাসূলুল্লাহর চাচাত ভাই আমাকে আপনি কড়া নেড়ে সংবাদ দিলেনা কেন। উত্তরে বলতাম- আল্লাহর নির্দেশ তাদের বাইরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
হযরত আবু ওবায়দা (রহ:) বলেন আমি কোনদিন কোন আলেমের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়া দেইনি বরং অপেক্ষা করেছি যে, তিনি নিজেই বাইরে আসলে সাক্ষাত করব। (রুহুল মা’আনী)







বঙ্গানুবাদ ঃ
১. মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের চেয়ে অগ্রগামী হয়োনা এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন।
২. হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের আওয়াজ রাসূলের আওয়াজের চেয়ে উচু করোনা এবং উচ্চস্বরে নবীর সাথে কথা বলোনা যেরুপ তোমরা নিজেরা পরস্পর বলে থাকো। এমন যেন না হয় যে; তোমাদের অজান্তেই তোমাদের সব কাজকর্ম ধ্বংস হয়ে যায়।
৩. যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে তাদের কন্ঠ নিচু রাখে তারাই সে সব লোক আল্লাহ যাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য বাছাই করে নিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহ পুরস্কার।
৪. হে নবী, যারা আপনাকে প্রাচীরের বাইরে থেকে ডাকাডাকি করতে থাকে তাদের অধিকাংশই নির্বোধ
৫. যদি তারা আপনার বের হয়ে আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারন করত তবে তাদের জন্য মঙ্গলজনক হতো। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
৬. হে ঈমানদারগণ, যদি কোন ফাসেক তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখ। এমন যেন না হয় যে, না জেনে শুনেই তোমরা কোন গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।
৭. ভালো করে জেনে রাখ আল্লাহর রাসূল তোমাদের মাঝে রয়েছেন। তিনি যদি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তোমাদের কতা মেনে নেন তবে তোমরাই অনেক সমস্যার মধ্যে পড়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ঈমানের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের কাছে পছন্দনীয় করে দিয়েছেণ। পক্ষান্তরে কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে ঘৃনিত করে দিয়েছেন।
৮. আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে এসব লোকই সৎপথের অনুগামী। আল্লাহ জ্ঞানী ও কুশলী।
নামকরণ ঃ ৪র্থ আয়াতের বাক্য থেকে গৃহীত।
নাযিল হওয়ার সময়কাল ঃ বিভিন্ন বর্ণনা ও সুরার বিষয়বস্তু থেকে বোঝা যায় এ সুরা বিভিন্ন পরিবেশ ও ক্ষেত্র নাযিল হওয়া হুকুম আহকাম ও নির্দেশ সমূহের সমষ্টি। বিষয়বস্তু সাদ্যৃশ্যের কারনে এগুলোকে এখানে একত্রিত করা হয়েছে।
৪র্থ আয়াত সম্পকে ঘটনা -
একবার বনী তামিম গোত্রের কিছু লোক রাসূল (সা:) এর নিকট উপস্থিত হয়। এই গোত্রের শাসনকর্তা নিয়োগ সম্পর্কিত আলোচনা চলছিল। হযরত আবু বকর (রা:) রা’কা ইবনে হাকিমের নাম এবং হযরত উমর (রা:) আকরা ইবনে হাফসের নাম প্রস্তাব করেন। হযরত আবু বকর (রা:) এবং হযরত উমর (রা:) এর মধ্যে চলমান এ আলোচনা এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটিতে উন্নীত হয়ে উভয়ের কন্ঠস্বর উচু হয়ে যায়। (বুখারী)
হিজরী ৯ম সন এ প্রতিনিধি দলের আগমনের সময়। আলোচ্য আয়াতসমূহের অবতরণ সম্পর্কে কুরতুযীর ভাষ্য অনুযায়ী ৬টি ঘটনা বর্ণিত আছে। সব ঘটনা নির্ভুল।


৬ষ্ঠ আয়াত সম্পর্কে ঘটনা ঃ
মুসনাদে আহমাদের বরাত দিয়ে ইবনে কাসীর -
বনী মুস্তালিক গোত্রের সরদার হারেস ইবনে মেরাব ইসলাম গ্রহণের পর রাসুল (সা:) তাকে যাকাত প্রদানের আদেশ দিলেন। তিনি যাকাত প্রদানে স্বীকৃত হলেন এবং তারা গোত্রে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে তাদের যাকাত আদায় করে জমা করে রাখবেন বললেন এবং রাসূল (সা:) কে একটি নিদিষ্ট তারিখে যাকাতের অর্থ নেবার জন্য কোন দুত পাঠাতে বললেন। কিন্তু নির্ধারিত তারিখ পার হয়ে গেলেও দুতের দেখা না পেয়ে হারেস আশংকা করলেন রাসূল (সা:) কোন কারনে তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং একথা তিনি ইসলাম গ্রহনকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছে প্রকাশ করে রাসূল (সা:) এর সাথে সবাই মিলে দেখা করার ইচ্ছা করলেন। এদিকে রাসূল নির্ধারিত তারিখে ওলীদ ইবনে ওকবা কে প্রেরণ করলেও তিনি পথিমধ্যে ধারনা করেন এই গোত্রের লোকদের সাথে তার পুরাতন শত্র“তা আছে। তাকে একা পেয়ে হত্যা না করে ফেলে। তিনি ফিরে আসেন এবং রাসূল (সা:) কে বলেন তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছে। রাসূল (সা:) রাগান্বিত হয়ে খালিদ ইবনে ওলীদের নেতৃত্বে একদল মুজাহিদ প্রেরণ করেন। অত:পর তা জানতে পেরে হারেস রাসূল (সা:) কে বলেন তিনি ওলীদকে দেখেনইনি।
কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে - ওলীদ ইবনে ওকবা (রা:) নির্দেশ অনুযায়ী বনু মুস্তালিক গোত্রে পৌছেন। গোত্রের লোকেরা অভ্যর্থনা জানানোর উদ্দেশ্যে বস্তি থেকে বের হয়ে আসে। ওলীদ সন্দেহ করে তারা বোধ হয় পুরাতন শত্র“তার কারনে তাকে হত্যা করতে আসছে। তিনি সেখান থেকে ফিরে এসে এ ধারনা ব্যক্ত করলে রাসূল (সা:) খালিদ ইবনে ওলীদ কে ঘটনা পর্যবেক্ষনের নির্দেশ দিলেন। তিনি ফিরে এসে সংবাদ দিলেন তারা ঈমানের উপর অটল রয়েছে/যাকাত দিতে প্রস্তুত।
ওলীদ ইবনে উকবা মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমান হয়েছিলেন।
তাই এটি স্পষ্ট যে এ যুগের বেশীর ভাগ অংশই মাদানী যুগের শেষ পর্যায়ে নাজিলকৃত।
আলোচ্য বিষয় ঃ
এ সুরার বিষয়বস্তু হলো মুসলমানদেরকে এমন আদব-কায়দা, শিষ্টাচার ও আচরন শিক্ষা দেয়া যা তাদের ঈমানসুলভ স্বভাব-চরিত্র ও ভাবমূর্তির উপযুক্ত ও মানানসই।
 প্রথম পাঁচ আয়াতে আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে আদব কায়দা শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
 এরপর নির্দেশ দেয়া হয়েছে প্রতিটি খবর বিশ্বাস করা এবং সে অনুযায়ী কর্মকান্ড করে বসা ঠিক নয়।
 মুসলমানদের দুটি দল যদি কোন সময় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সে ক্ষেত্রে অন্য মুসলমানদের কর্মনীতি।
 মুসলমানদেরকে কিছু খারাপ বিষয় থেকে আতœরক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে-
ড় একে অপরকে ঠাট্রা-বিদ্রুপ করা
ড় বদনাম উপহাস করা
ড় উপনামে ডাকা
ড় গোপন বিষয় খোজাখুজি
 সবশেষে বলা হয়েছে- ঈমানের মৌখিক দাবী প্রকৃত জিনিস নয় বরং সরল মনে আল্লাহ ও রাসূলকে মানা, কার্যত অনুগত থাকা এবং কুরবানী।
১. প্রথম আদব - আল্লাহ ও রাসূলের চেয়ে অগ্রগামী না হওয়া। এটা ঈমানের প্রাথমিক ও মৌলিক দাবী।
 নিজের মতামত ও ধ্যান ধারনাকে আল্লাহ রাসূলের সিদ্ধান্তের চেয়ে অগ্রাধিকার দিতে পারেনা এবং বিভিন্ন ব্যাপারে স্বাধীন মতামত পোষন করতে পারেনা।
 সুরা আহযাবের ৩৬ আয়াতে এরুপ নির্দেশ আল্লাহ ও তার রাসূল যে বিষয়ে ফয়সালা করে দিয়েছেন সে বিষয়ে আলাদা কোন ফয়সালা করার ইখতিয়ার কোন ঈমানদারের জন্য আর অবশিষ্ট থাকে না।
 এ নির্দেশটি শুধু ব্যক্তিগত নয় বরং মুসলমানদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য (সরকার, বিচারালয়, পার্লামেন্ট) সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীস ঃ
মুয়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেনের বিচারক করে পাঠানোর সময় নবী (সা:) তাকে জিজ্ঞেস করলেন “তুমি কিসের ভিত্তিতে ফয়সালা করবে?” তিনি বললেন- “আল্লাহ কিতাব অনুসারে।” নবী (সা:) বললেন যদি কিতাবে না পাওয়া যায় তিনি জবাব দিলেন আল্লাহ রাসূলের সুন্নাতের সাহায্য নেব? নবী (সা:) বললেন যদি সেখানে না পাও তিনি জবাব দিলেন তাহলে আমি নিজে ইজতেহাদ করব। তাই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাবই সর্বপ্রথম উৎস এবং তারপরই হাদীসের স্থান। এবং এক্ষেত্রে নিজেদের মতামতকে প্রাধান্য দিলে বোঝাপড়া হবে আল্লাহর সাথে।
২. যারা রাসূল (সা:) এর মজলিশে যাতায়াত করত তাদেরকে এ আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্যে তার সাথে কথা বলার সময় যেন তার মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রাখা হয়।
 এক্ষেত্রে যখনই নবী (সা:) এর আলোচনা করা হয় এবং তার হাদীস বর্ণনা করা হয় তখন পরবর্তী সময়ের লোকদের অনুরুপে শিষ্টতা বজায় রাখা দরকার
 এছাড়া নিজের চাইতে উচ্চ মর্যাদার লোকদের সাথে কথা বলার শিষ্টতা এখানে শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
 ইসলামে রাসূলের ব্যক্তিসত্ত্বার মর্যাদা এ আয়াত থেকে বোঝা যায়। রাসূলের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সামান্য শিথিলতায় সারা জীবনের সঞ্চিত পুজি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। নবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা না করা মূলত আল্লাহর প্রতি করা না করার পর্যায়ভুক্ত।
৩. অর্থ্যাৎ যে হৃদয়ে রাসূলের মর্যাদা নেই সে হৃদয়ে তাকওয়া থাকতে পারেনা। যারা বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তারা রাসূলের প্রতি তাদের পক্ষ থেকে যথাযথ মর্যাদা প্রদর্শন করে।
৪. আরবের সে পরিবেশে যেখানে সাধারন ভাবে মানুষ কোন প্রকার শিষ্টাচারের শিক্ষা পায়নি তাদের অনেকেই সময়ে সময়ে রাসূলের সাথে সাক্ষাতের জন্য হাজির হতো তার হুজরার চারিদিকে ঘুরে ঘুরে বাইরে থেকেই তাকে ডাকতো। স্বভাবগত কারনেই রাসূল (সা:) এসব সহ্য করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করলেন।
৫. অর্থ্যাৎ চিৎকার না করে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে রাসূল নিজেই এসে তাদের সাথে সাক্ষাত করতেন। এ আয়াতে এ ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন।
৬. অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে এটি ওলীদ ইবনে ওকবা ইবনে আবা মুআ’ইত সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।
হারেস ইবনে মেরার (উম্মুখ মুমিনিন হযরত জুয়াইরিয়ার পিতা) এক প্রতিনিধি দল নিয়ে রাসূলের দরবারে হাযির হন।
হযরত উম্মে সালামা বর্ণিত হাদীসে পুরো ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামের নাজুক পরিস্থিতিতে যখন একটি ভিত্তিহীন সংবাদকে কেন্দ্র করে এত বড় ভুল সংঘটিত হতে যাচ্ছিল সে মুহুর্তে আল্লাহ এ মৌলিক নির্দেশ দিলেন যে, যখন এমন কোন খবর পাওয়া যাবে যার ভিত্তিতে বড় রকমের কোন ঘটনা সংঘটিত হতে পারে তখন তা বিশ্বাস করার পূর্বে বার্তাবাহক কেমন ব্যক্তি তা যাচাই করতে হবে।
 যার বাহ্যিক অবস্থা দেখেই প্রতীয়মান হয় যে বার্তাবাহক নির্ভরযোগ্য নয় (ফাসেক) তবে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী কাজ করার পূর্বে তা যাচাই করা দরকার।
 যার চরিত্র ও কর্ম নির্ভরযোগ্য নয় এমন কোন সংবাদদাতার সংবাদের উপর ভিত্তি করে কোন, ব্যক্তি, জাতি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা ইসলামী সরকারের জন্য বৈধ নয়।
হাদীস শাস্ত্রবিদগণ এ প্রেক্ষিতে ‘জারহ ও তা’দীল’ এর নীতি উদ্ভাবন করেছেন।
 যাতে যাদের মাধ্যমে নবী (সা:) এর হাদীস পরবর্তী বংশধরদের নিকট পৌছেছিল তাদের অবস্থা যাচাই করা যায়।
 তাছাড়া সাক্ষ্য আইনের ক্ষেত্রে নীতি হলো এমন কোন ব্যাপারে ফাসেক ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহনযোগ্য হবেনা যা দ্বারা শরীয়তের কোন নির্দেশ প্রমানিত হয় কিংবা কোন মানুষের উপর কোন অধিকার বর্তায়।
তবে সাধারন পার্থিব ব্যাপারে প্রতিটি খবর অনুসন্ধান এবং সংবাদাতার নির্ভরযোগ্যতা জরুরী নয়। কারন আয়াতে গুরুত্বপূর্ণ খবর বলা হয়েছে।
৭. বন্ধু মুসতালিক গোত্র সম্পর্কে ওয়ালীদ ইবনে উকরার খবরের ভিত্তিতে নবী (সা:) তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহন করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু কিছু সাহাবী তৎক্ষনাৎ তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন করার জন্য নবী (সা:) কে পীড়াপীড়ি করছিল। এ প্রেক্ষিতে এই আয়াত।
৮. অর্থ্যাৎ কতিপয় লোক তাদের অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত জানালেও মুসলমানদের গোটা জামায়াত ভুল করেনি। মুমিনদের সঠিক পথের উপর কায়েম থাকার কারন হচ্ছে আল্লাহ তার দয়া ও মেহেরবানীতে ঈমানী আচরনকে তাদের জন্য প্রিয় ও হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন এবং নাফরমানী আচরনকে ঘৃনিত করে দিয়েছেন।
আয়াতের দুটি অংশে দুটি ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। “যারা বনু মুসতালিকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য পীড়াপীড়া করছিল তাদের কথা বলা হয়েছে।”
“কথা বলা হয়েছে যারা নিজেদের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করেনি। বরং ঈমানের দাবীর উপর ছিলেন।
তবে তারা ঈমানের প্রতি অটল ছিলনা একথা বলা হয়নি, বরং শিথিলতার কথা বলা হয়েছে। তাই তিনি (আল্লাহ) প্রথমে এর ভুল ও কুফল তুলে ধরেছেন।
৯. আল্লাহর অনুগ্রহ ও মেহেরবানী কোন ভাগ বাটোয়ারা নয়। তিনি এ বিরাট নেয়ামত জ্ঞান যুক্তির ভিত্তিতে দান করেন।
শিক্ষা ঃ
১) ধর্মীয় আলেমদের ক্ষেত্রে এ বিধান কার্যকর কারন তারা পয়গম্বরদের উত্তরাধিকারী।
- একদিন রাসূল (সা:) আবু দারদা (রা:) কে আবু বকর (রা:) এর অগ্রে চলতে দেখে সর্তক করে বললেন: তুমি কি এমন ব্যক্তির অগ্রে চল যিনি ইহকাল ও পরকালে তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ? তিনি আরও বললেন: দুনিয়াতে এমন কোন ব্যক্তির উপর সুর্যোদয় ও সুর্যাস্ত হয়নি যে পয়গম্বরদের পর হযরত আবু বকর থেকে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। (রুহুল বয়ান)
-
২) উচ্চ স্বরে কথা না বলা ঃ
এ আয়াত নাযিলের পর -
 হযরত আবুবকর (রা:) আরজ করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ আল্লাহর কসম! এখন মৃত্যু পর্যন্ত আপনার সাথে কানাকানির অনুরুপে কথা বলব। (বায়হাকী)
 হযরত উমর (রা:) এরপর থেকে এত আস্তে কথা বলতেন যে, প্রায়ই পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হতো। (সেহাহ)
 হযরত সাবেত ইবনে কায়সের কন্ঠস্বর স্বভাবগতভাবেই উচু ছিল। এ আয়াত নাযিলের পর তিনি ভয়ে সংযত হলেন এবং কন্ঠস্বর নিচু করলেন। (দুররে মনসুর)
 কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী (রহ:) বলেন রাসূল (সা:) এর সম্মান ও আদব তার ওফাতের পরও জীবদ্দশার ন্যায় ওয়াজিব। কোন কোন আলেম বলেন তার কবরের সামনে উচ্চস্বরে কথা বরা আদবের খেলাফ। যে মজলিসে হাদীস পাঠ হয় সেখানে হট্টগোল করা বে-আদবী।
 কন্ঠস্বর উচু করলে আমল বিনষ্ট হবে কেন?
 সৎকর্ম বিনষ্ট করে-
১) কুফরী ২) ঈমান ইচ্ছাধীন কাজ কুফরীও ইচ্ছাধীন কাজ।
কিন্তু আয়াতে বলা হয়েছে। সুতরাং এখানে কুফরীর শাস্তি কিভাবে হতে পারে।
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ:) তার বায়ানুল কুরআনে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন - রাসূলের কন্ঠ থেকে উচু হলে বিনষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে কারন রাসূল কষ্ট পাবেন।
৩) হুজরার বাইরে থেকে ডাকাডাকি করা ঃ
- ইমাম বগাভী (রহ:) কাতাদাহ (রা:) এর রেওয়ায়েতক্রমে বর্ণনা করেন বনু তামীমের লোকগণ দুপুরের সময় মদীনায় উপস্থিত হয়েছিল। তখন রাসূল (সা:) কোন এক হুজরায় বিশ্রামরত ছিলেন। তারা ছির বেদুঈন এবং সামাজিকতার রীতি নীতি থেকে অজ্ঞ। তারা হুজরার বাইরে থেকেই ডাকাডাকি শুরু করল।
- “হে মুহাম্মদ আমাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আসুন” (মাযহারা)
ড় সাহাবী ও তাবেয়ীগণ তাদের আলেমদের সাথেও অনুরুপ ব্যবহার করতেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত আছে- আমি যখন কোন আলেম সাহাবীর কাছে থেকে কোন হাদীস লাভ করতে চাইতাম তখন তার গৃহে পৌছে ডাকাডাকি বা দরজার কড়া নাড়া থেকে বিরত থাকতাম এবং দরজার বাইরে বসে অপেক্ষা করতাম। তিনি যখন নিজেই বাইরে আসতেন তখন আমি তার নিকট হাদীস জিজ্ঞেস করতাম। তিনি দেখে বলতেন হে রাসূলুল্লাহর চাচাত ভাই আমাকে আপনি কড়া নেড়ে সংবাদ দিলেনা কেন। উত্তরে বলতাম- আল্লাহর নির্দেশ তাদের বাইরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
হযরত আবু ওবায়দা (রহ:) বলেন আমি কোনদিন কোন আলেমের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়া দেইনি বরং অপেক্ষা করেছি যে, তিনি নিজেই বাইরে আসলে সাক্ষাত করব। (রুহুল মা’আনী)

মন্তব্য

BLOGGER
Share this contant
নাম

২৯ পারা,1,অনুবাদ,11,আযান,2,আল-কুরআন,15,ইসলামি সংগিত,12,ইসলামী বই,15,কবীরা গুনাহ,1,জানাজার দোয়া,1,জিকির,1,জীবনি,1,তাফসীর,1,দাজ্জাল,1,দিবস,1,দোআ,15,দোয়া,12,নফল সলাত,1,নবী-রাসূলদের গল্প,1,পুষ্টি গুন,13,প্রশ্ন-উত্তর,9,ফজিলত,1,ফিতনা,1,বিতর সলাত,1,বিদাআত,1,বিবাহ,2,মাসআলা-মাসায়েল,1,রমজান মাস,3,রোজা,1,শরিয়াহ,25,সলাত,2,সাওম,2,সাহাবাদের গল্প,1,সিয়াম,4,সুরা-নাস,1,হাদিসের কথা,26,Biography,1,Blog,2,Book-Review,1,Darsul Quran,9,event,2,Hadith,2,Hadith Books,3,History,3,Islamic Books,15,Islamic Song,11,Quran,3,Ramadan,1,Salat,1,Shariah,34,Story,43,Tafsir,2,Translate,11,Welcome Tune Code,8,
ltr
item
IslamerAlo.org: সূরা আল হুজরাত ১-৮
সূরা আল হুজরাত ১-৮
https://3.bp.blogspot.com/-E3yBe_thT3A/V5xJF0-WiRI/AAAAAAAACI0/62ogeGIUAwswV2OmYT3K_Uv9cuCqximNgCEw/s640/Untitled-2.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-E3yBe_thT3A/V5xJF0-WiRI/AAAAAAAACI0/62ogeGIUAwswV2OmYT3K_Uv9cuCqximNgCEw/s72-c/Untitled-2.jpg
IslamerAlo.org
https://www.islameralo.org/2015/05/blog-post_7.html
https://www.islameralo.org/
https://www.islameralo.org/
https://www.islameralo.org/2015/05/blog-post_7.html
true
8904195260339678263
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts সবগুলো দেখুন আরো পড়ুন উত্তর দিন Cancel reply Delete By Home পেইজ পোষ্ট সবগুলো দেখুন শুধু মাত্র আপনার জন্য LABEL ARCHIVE SEARCH সমস্ত পোষ্ট আপনার অনুরোধের পাতাটি পাওয়া যায়নি । আমরা দুঃখিত Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy